দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই ‘দোষী’! অপপ্রচার-যাচাইহীন সংবাদের শিকার সিডিএ প্রকৌশলী হাসান.
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-
আদালতে চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই সংবাদমাধ্যমে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা দেশের প্রচলিত আইন ও সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রকৌশলী হাসানকে নিয়ে প্রচারিত সংবাদগুলোর ক্ষেত্রে বিচারাধীন বিষয়ে একপাক্ষিক তথ্য প্রচার, তদন্তপদ্ধতির অসঙ্গতি এবং দায়িত্বের সময়কাল গুলিয়ে ফেলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বিচারাধীন মামলার নথিপত্র, প্রকৃত দায়িত্বকাল এবং প্রকৌশলগত তদন্তপদ্ধতি আড়াল করে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা। অনুসন্ধান ও মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণে এই প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুতর অসঙ্গতি এবং আইনি প্রশ্ন সামনে এসেছে।
মাত্র ১০ দিনের দায়িত্বের দায়?
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ২০১২ সালের দুটি স্পেশাল মামলায় (মামলা নং-৪১/২০১২ এবং ৪৩/২০১২) প্রকৌশলী হাসানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে নথিপত্র অনুযায়ী, যে প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে এই মামলা, সেখানে প্রকৌশলী হাসানের দায়িত্বের সময়কাল ছিল মাত্র ১০ দিন! ২০০৮ সালের ৮ জুন তিনি উক্ত প্রকল্পে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সরজমিন পরিদর্শনেই তিনি দাপ্তরিক নোটে উল্লেখ করেন যে, প্রকল্পের মূল কাজ তার যোগদানের আগেই পূর্ববর্তী প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে উপ-সহকারী প্রকৌশলীর প্রত্যয়নের ভিত্তিতে ঠিকাদারের প্রথম রানিং বিলের (১ম মামলার বিল ২,৩৮,৩৪৭ টাকা এবং ২য় মামলার বিল ২,৬০,৯৫৪ টাকা) ফরোয়ার্ডিং প্রক্রিয়ায় তিনি যুক্ত হন। প্রশ্ন উঠেছে, যে কাজের বাস্তবায়ন ও তদারকির সঙ্গে তিনি যুক্তই ছিলেন না, তার দায় মাত্র ১০ দিনের একজন কর্মকর্তার ওপর কতটুকু বর্তায়?
তদন্তপদ্ধতি ও পুনঃপরিমাপের আইনি ধোঁয়াশা
Sub-Base বা কার্পেটিংয়ের নিচের স্তর পরিমাপের প্রকৌশলগত দিক নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৃশ্যমান পিচ ঢালাইয়ের অনেক পরে রাস্তার নিচের নির্মাণ সামগ্রীর নিখুঁত অনুপাত নির্ধারণ করা বেশ জটিল। প্রকৌশলী হাসানের দাবি, তদন্তকারী দল যে পদ্ধতিতে সাব-বেজ (Sub Base) ও সাব-গ্রেড (Sub Grade) স্তরের ঘাটতি দেখিয়েছে, তা প্রচলিত বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যথাযথ ও আধুনিক প্রকৌশলগত পরীক্ষা ছাড়া কেবল অনুমানের ভিত্তিতে আর্থিক আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অংক নির্ধারণের বিষয়টি তদন্তের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একই প্রকল্পে ২২ মামলা: সিডিএর দ্বিমুখী নীতি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কে কেন্দ্র করে দুদক মোট ২২টি মামলা দায়ের করেছিল। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, একই সময়ের কর্মকাণ্ড এবং একই মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও সিডিএর একাধিক প্রকৌশলী বর্তমানে বহাল তবিয়তে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বা বড় বড় প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ কেবল প্রকৌশলী হাসানের ক্ষেত্রেই সাময়িক বরখাস্তসহ কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই দ্বিমুখী নীতির বিষয়ে সিডিএর একজন ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও নিয়মতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে করা হয়েছে। তবে অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন ব্যবস্থা, তা খতিয়ে দেখার বিষয়।”
হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা ও আইনি विशेषज्ञों মত
মামলাটির সার্বিক পরিস্থিতি ও নথিপত্র বিবেচনা করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট ইতিমধ্যেই এই প্রক্রিয়ার ওপর ‘স্থিতাবস্থা’ (Status Quo) আদেশ জারি করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মতে, “যখন কোনো বিষয়ে উচ্চ আদালত স্থিতাবস্থা জারি করেন এবং বিষয়টি বিচারিক নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে, তখন সংবাদমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একপাক্ষিক প্রচার চালিয়ে কাউকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা আদালত অবমাননার (Contempt of Court) শামিল।”
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সংকট
গণমাধ্যমের মূল নীতি হলো যেকোনো অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য বা ব্যাখ্যা প্রকাশ করা। কিন্তু প্রকৌশলী হাসানের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে তার কোনো বক্তব্য বা দাপ্তরিক নথির সত্যতা যাচাই না করেই একপাক্ষিক প্রচারণা চালানো হয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত রায় আসার আগেই গণমাধ্যমে কাউকে ‘অপরাধী’ হিসেবে সাব্যস্ত করার এই প্রবণতা কেবল একজন নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে না, বরং দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপরও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে।
আদালতের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান বলেন, “আমি বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ন্যায়বিচার পাব বলে দৃঢ় আশাবাদী। তবে তথ্য যাচাই না করে জনসমক্ষে আগাম রায় দেওয়ার অনৈতিক প্রবণতা বন্ধ হওয়া উচিত।” আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক—এটাই এখন সচেতন মহলের প্রত্যাশা।